রাতুলের ভুত দর্শন




○•○•○
রাতুলের সাথে ইমনের অনেকদিন যাবত বন্ধুত্ব। ইমন গ্রাম থেকে যখন লেখাপড়া করতে শহরের কলেজে ভর্তি হয় তখন রাতুলই তাকে প্রথম বন্ধুর মত আপন করে নেয়। রাতুল ও ইমনের মাঝে অনেক মিল। এই কারনে তাদের সম্পর্কটা আরো গভীর হয়।

রাতুল শহরে বড় হওয়া ছেলে তবে সে গ্রামকে ভালবাসে সুযোগ পেলে গ্রামে যেতে চায়। তাই সে ইমনকে বলল আগামী বন্ধের সময় সে ইমনদের গ্রামে যেতে চায়। ইমনতো এককথায় রাজি। রাতুল তাদের গ্রামে গেলে তার বাবা মা অনেক খুশী হবে।

কলেজ ছুটি হওয়ার পরদিন ইমন রাতুলকে নিয়ে তার গ্রামের উদ্যেশ্যে রওনা হয়। ইমনদের গ্রাম ঢাকা থেকে বাসে চার ঘন্টার পথ, তারপর রিকশায় চল্লিশ মিনিট যেতে হয়। বাসে বসে গল্প করতে করতে কিভাবে সময় চলে গেল তারা টেরই পায়নি। তারা বাস থেকে নেমে রিকশা করে ইমনদের গ্রামের দিকে রওনা দেয়।


○•○•○

ইমনদের গ্রামটি অনেক সুন্দর। চারদিকে সবুজ, গ্রামের একদম মাঝখান দিয়ে একটি নদী বয়ে চলছে। রাতুল যেদিকেই তাকাচ্ছে সেদিক থেকেই যেন দৃষ্টি ফেরাতে পারছেনা। সে মুগ্ধ নয়নে প্রকৃতি দেখে যাচ্ছে, গ্রাম এত সুন্দর হয় তা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছেনা।

কিছুক্ষনের মাঝেই রিকশা তাদের বাড়িতে পৌছে। ইমন রাতুলকে নিয়ে তার বাবা মা ও বোনের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়। রাতুলকে পেয়ে সবাই খুশী। ইমনের বাবা জানতে চায় আসতে কোন সমস্যা হয়নিতো, তার কোন সমস্যা হয়নি বলে আশ্বস্ত করে। ইমনের মা রাতুলকে গোছল করে খেতে বলে। গোছল করে খাওয়া দাওয়া পর বিকাল বেলায় তারা গ্রাম দেখতে বের হয়।

প্রথমেই তারা যায় নদীর ধারে, সেখানে কিছক্ষন বসে থেকে তারা গ্রামের হাটে যায়। হাটটিকে রাতুলের অনেক পছন্দ হয়, হাটে অনেক লোকজন থাকলেও কোন কোলাহল নেই, প্রকৃতির যেন সব কোলাহলকে ডেকে দিচ্ছে। সন্ধ্যা নামার আগে আগে তারা বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

ফেরার পথে ইমন রাতুলকে একটি অন্ধকার জঙল দেখিয়ে বলে গ্রামের কেউ এই জঙলে ঢুকেনা। রাতুল অবাক হয়ে এর কারন জিজ্ঞেস করে।
ইমন বলল, অনেকদিন আগে এই জঙলের কাছেই একটি বাড়িতে এক বৃদ্ধা বসবাস করত। মানুষের বাড়িতে কাজ করে সে দিনযাপন করত। একবার এক ডাকাতদল পালাতে এসে তার বাড়িতে উঠে এবং বুড়ি তাদের জায়গা দিতে না চাওয়াই তারা বুড়ির দুই চোঁখ উপড়ে বুড়িকে অন্ধ বানিয়ে দেয়।
বুড়ি অন্ধ হওয়ার পর সবাই তাকে কানা বুড়ি নামে ডাকত, কিন্তু তাকে কেউ আর কাজ দিতে চাইত না। সে ভিক্ষা করে খেতে চাইত না, তাই অনেকদিন না খেয়ে থাকত। মনের দুঃখে ক্ষুদার যন্ত্রনায় বুড়ি একরাতে নিজের শরীলে আগুন লাগিয়ে আত্বহত্যা করে।

তারপর থেকে কেউ রাতে ঐদিকে গেলে চোঁখে কিছু দেখতে পায়না, পথ হারিয়ে ফেলে এবং অদ্ভুত সব চিৎকার শুনতে পায়। মনে হয় যেন তাকে কেউ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে।

রাতুল বলে, তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস মহিলা মরে ভুত হয়ে গেছে। তুই ভুতে বিশ্বাস করিস? আমি বিশ্বাস করিনা ভুত আছে। আজ রাতে আমি ঐ জঙলে যাব ভুতের সাথে মোলাকাত করব।

ইমন রাতুলকে সাবধান করে দিয়ে বলে "রাতুল পাগলামী করিসনা আমি একটুও মিথ্যা বলছিনা, অনেক প্রত্যক্ষদর্শী আমাকে এই কথা বলেছে।

কিন্তু রাতুল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সে ভুত দর্শনে যাবেই। যদিও সে এটা ইমনকে বুঝতে দিল না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে তারা বাড়ির দিকে রওনা দিল।

বাড়ির সবাই তাদের জন্য খাবার নিয়ে বসে রয়েছে। খাবার খেয়ে হালকা গল্পগুজব করে তারা ঘুমাতে গেল।

•○•○•
রাত ১:১৩।
বাড়ির সবাই যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন রাতুল তখনও সজাগ। সে ঘুমায়নি কারন সে ভুত দর্শনে যাবেই। সে তার মোবাইলটি নিয়ে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে আসল। ঘরের দরজা খুলে চারপাশে দেখে নিল কেউ আছে কিনা, কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে সে রওনা দিল তার ভুত দর্শন অভিযানে।

•○•○•
চারদিকে অন্ধকার, আকাশে চাঁদ থাকলেও আজ চাঁদের আলো নেই। মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ মাঝে মাঝে উকি দেয় নিচে কি ঘটছে তা দেখার জন্য হয়ত। দুর থেকে থেমে থেমে বাদুর, পেঁচা আর বিভিন্ন নিশাচর প্রাণীর আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে রাতুল মোবাইল টর্চের আলোয় এগিয়ে চলছে একা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে জঙলটিকে কাছেই দেখেছিল কিন্তু এখন তার কাছে মনে হচ্ছে জঙলটি অনেক দুর। সে যেন কতকাল যাবত হেটে চলেছে তার হিসাব কষতে পারছে না। আরো কিছুদুর যাওয়ার পর সে একটি ভাঙা বাড়ি দেখতে পেল, সে বুঝতে পারল এটিই কানা বুড়ির বাড়ি।

সে বাড়িটি পাশ কাটিয়ে জঙলের ভিতরের দিকে যেতে থাকল। হঠাৎ খেয়াল করল সে তার পা নাড়াতে পারছে না, কে যেন তার পা জোর করে আকড়ে ধরেছে। মোবাইলের আলো পায়ের কাছে এনে দেখতে পেল কিছু লতায় তার পা আটকে গেছে। সে এখান থেকে মুক্তি নিয়ে আবার সামনে এগুতো লাগল। এবার তার মনে হতে লাগল কেউ তার পিছু নিয়েছে হয়ত এখনই তাকে ঝাপটে ধরবে, সে তাড়াতাড়ি করে উল্টো দিকে ঘুরতেই কিছু বাদুর তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। পিছন থেকে হঠাৎ কে যেন তার কাধে হাত রাখল, বৈদ্যতিক শক খাওয়ার মত করে সরে গেল সে। মোবাইলের আলোয় দেখল উপড় থেকে একটি শুকনা পাতা তার কাধে পরেছিল। অযথা ভয় পাওয়ার জন্য নিজেকে সে গালি দিতে লাগল।

হঠাৎ তার মোবাইলটি বন্ধ হয়ে গেল, সে ভাবতে লাগল মোবাইলেতো ফুল চার্জ দেওয়া ছিল তাহলে বন্ধ হল কেন? কি হতে চলেছে সে কিছুই বুঝতে পারছেনা। তার চারপাশে যেন রাজ্যের সব অন্ধকার নেমে এসেছে, কোন কিছুই সে দেখতে পাচ্ছেনা। কোথায় যাবে বুঝে উঠতে পারছে না। সে যতই বলুক কোথাও কোন ভুত নেই, ভুতকে সে বিশ্বাস করে না তবুও এই মুহুর্ত্বে তার মাঝে আতংক ভর করেছে। তার মস্তিস্ক থেকে মেরুদন্ড বেয়ে রক্তের শিতল ধারা বয়ে যাচ্ছে, হৃদপিন্ড বক্ষ পিন্জ্ঞরে আঘাত করে বেড়িয়ে আসতে চাইছে যেন। সে স্পষ্ট গোঙানীর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে, আর অদ্ভুত সব চিৎকার ভেসে আসছে তার চারপাশ থেকে। হঠাৎ কে যেন তার গলা চেপে ধরে সে নিজেকে রক্ষার জন্য প্রাণপন চেষ্ঠা করতে থাকে। তার নিশ্বাস বন্ধ হতে থাকে, তার চোঁখের সামনে প্রিয়জনদের মুখ ভেসে উঠতে থাকে।

•○•○•
পরদিন সকাল
রাতুলের জ্ঞান ফিরেছে, তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে ইমনদের বিছানায়, ইমনদের পরিবারের সবাই তাকে ঘিরে আছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতুলকে বিছানায় না পেয়ে ইমন লোকজন নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হয়, অনেক খুঁজার পর তাকে সে নদীর তীরে পরে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসে।
ইমন রাতুলকে জিজ্ঞেস করল রাতে কোথায় গিয়েছিলে, কি হয়ছিল? রাতুল সব খুলে বলে এবং বলে তারপর কি ঘটেছিল আমার মনে নেই, মনে হয়েছিল আমি মারা যাব কিন্তু কিভাবে বেচে গেছি জানি না।

ইমন বলতে থাকে " আমি আগেই তোকে সাবধান করেছিলাম, এখন যদি কিছু হয়ে যেত আমি কিভাবে মুখ দেখাতাম।"
রাতুল চুপ করে থাকে।

ইমনের বাবা রাতুলকে নিয়ে চিন্তায় পরে যায়, তাই তিনি ইমনকে বলেন রাতুল একটু সুস্থ হলে তাকে যেন তাড়াতাড়ি ঢাকায় নিয়ে যায়। ইমনেরও তাই ইচ্ছা, তাই ঐদিন বিকালেই সে রাতুলকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বৈঠকঘর