চর কাসিন্দপুর গ্রামে ছিল অনেক তেঁতুল গাছ। তেঁতুল গাছগুলোতে ছিল ভুত ও পেত্নীদের রাজত্ব। প্রতি রাতে ভুত ও পেত্নীরা গাছ থেকে নেমে মানুষকে ভয় দেখাত ও সুযোগ পেলে কারো ঘাড় মটকিয়ে সকাল হতে না হতেই নিজ নিজ গাছে ফিরে আসত।
সেখানের এক তেঁতুল গাছে বাস করত পেত্নী ইংলা। রুপে গুনে সবার সেরা। এলাকার সব ভুতেরা তার জন্য পাগল কিন্তু সে বলে দিয়েছে কেউ যদি কখনো তার কোন উপকারে আসতে পারে তাহলে তাকে সে মন দিবে।
তার পাশের গাছের প্রতিবেশী ছিল বিন্তাল যে কিনা ইংলার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু ইংলার এক কথা যে তার কোন দিন উপকারে আসবে তাকেই সে মন দিবে।তাই বিন্তাল পাত্তা পেলনা।
এভাবে কেটে গেল অনেক দিন। একরাতে ইংলা গাছ থেকে নেমে কাকে ভয় দেখিয়ে ঘাড় মটকানো যায় তা দেখছিল। তখন ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল ভুতুরাজ জামসেদ যে পেত্নী ও ভুতকে ধরে নিজের কাছে রাখা একটি বোতলে ভরে রাখত। ইংলা তাকে চিনতে না পেরে তার ঘাড় মটকাতে যায় এবং ধরা খায়। তাকে বোতলে ভরে রাখার ভয় দেখানো হয়, আর সে জানে তাকে যদি একবার বোতলে ভরতে পারে তাহলে সে আর মুক্তি পাবেনা। তাই সে প্রাণ বাচাতে কান্নাকাটি করতে থাকে। তখন ঐ পথ দিয়ে তখন যাচ্ছিল বিন্তাল। সে ইংলাকে বাঁচানোর জন্য এমন এক চিৎকার দিল যা শুনে এক ক্রুশ পর্যন্ত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। এই সুযোগে সে ইংলাকে নিয়ে পালিয়ে আসে।
বিন্তাল যেহেতু ইংলার কাজে লেগেছে সে তার জীবন বাচিয়েছে তাই ইংলা বিন্তালকে বিয়ে করার জন্য রাজি হয়ে গেল। মহা ধুমধামে ভুত রাজ্যের মহাপতি মান্যগন্য জগন্য ও নগন্য ভুতদের উপস্থিতিতে তাদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল।
তাদের জীবন সুখে শান্তিতে কাটছিল। এখন কোথাও গেলে দুজন একসাথে যায়। দুজন একসাথে অন্যের ঘাড় মটকায় এবং সবাইকে ভয় দেখায়। সারারাত ঘুরেবেড়ায় ও সকাল হওয়ার আগেই গাছে চলে এসে। ভুত রাজ্যের সবাই তাদেরকে সুখী দেখে সাধুবাদ জানায়। এভাবে চলছিল তাদের রাত ও দিন। একদিন তাদের কোল আলোকিত করে তাদের ঘরে নতুন মেহমান আসে। ভুত রাজ্যে তখন খুশীর জোয়ার বইছে। এই খুশীতে সব ভুত মানুষদের ঘাড় না মটকিয়ে শুধু কাতুকুতু দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ঐ নতুন ভুতের নাম রাখা হয় ইন্তাল। ইন্তাল ভুত পাড়ার সবার আদর পেয়ে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে।
বিন্তাল একদিন তার ছেলে ইন্তালকে নিয়ে মানুষকে কিভাবে ভয় দেখাতে হয় এবং ঘাড় মটকাতে হয় তা শিখাতে নিয়ে যায়। কিন্তু ইন্তালের এসব ভাল লাগেনা। সে শুধু মানুষকে কাতুকুতু দিয়ে মজা পায়। আর মাঝে মাঝে মানুষের মাছ চুরি করে।
এক সন্ধ্যায় এক বৃদ্ধ মহিলা লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। অনেকদিন পর আজ তার ছেলে তার কাছে আসবে। তাই সে সারাদিন ভিক্ষা করে কিছু টাকা দিয়ে একটি মাছ কিনেছে রাতে ছেলে আসলে একসাথে খাবে। বুড়ি যখন ইন্তালদের তেতুল গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছিল তখন ইন্তাল নিচে এসে বুড়ির থলে থেকে মাছটি খেয়ে ফেলল এবং বুড়ির পিছন পিছন যেতে থাকল।বুড়ি বাড়িতে গিয়ে থলে খুলে দেখে থলেতে কোন মাছ নেই। এটা দেখে সে হু হু করে কেদে উঠল এবং বলতে লাগল "এখন আমার ছেলেকে আমি কি দিয়ে খাওয়াব? কতদুর থেকে আমার ছেলে সোনা মানিক আসবে। কে আমার এই মাছটি খেলো?" মনের দুঃখে সে বিলাপ করে কাদতে লাগল। ইন্তাল বুড়ির কথা শুনে কষ্ট পেলো মনে মনে চিন্তা করল বুড়িকে কিছু মাছ এনে দিতে হবে।
আজ রাতে বিন্তাল আবার ইন্তালকে নিয়ে বের হল ঘাড় মটকানো শেখাতে। সে গাছ থেকে নেমেই সামনে একজনকে পেলো হেটে হেটে যাচ্ছে। বিন্তাল সরাসরি ঐ লোকটির ঘাড়ে বসে ঘাড়টিকে উল্টোদিকে একটি মোচর দিলো এবং সাথে সাথে লোকটি পরে মারা গেল। লোকটির মারা যাওয়া দেখে বিন্তাল হু হু করে হাসতে লাগল। কিন্তু এটি ইন্তালের কোমল মন মেনে নিতে পারল না।
ইন্তালের কোমল মন কিছুতেই অহেতুক একটি মানুষকে এভাবে মেরে ফেলাকে মেনে নিতে পারেনি। সে ভাবছে মানুষটির পরিবার তাকে না পেয়ে না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে। তাই সে চিন্তা করল এই মানুষটির পরিবারকে সে সাহায্য করবে। কিন্তু তার আগে সে বুড়ির জন্য মাছের ব্যবস্থা করতে হবে তাই সে মাছের সন্ধানে বেড়িয়ে পরল। কিছুক্ষনের মাঝেই সে কিছু মাছ পেয়ে গেল। মাছগুলো নিয়ে সে ঐ বুড়ির বাড়িতে চলে গেল এবং বুড়ির কাছে রেখে দিল। বুড়ি বুঝতে পারছিলনা মাছ কোথা থেকে আসল তবুও সে মাছ পেয়ে খুশী হয়ে রান্না করতে চলল।
ইন্তাল সারারাত মানুষকে কাতুকুতু দিয়ে ও মাছ চুরি করে খেয়ে ভোর হওয়ার আগেই তার গাছে ফিরে যাচ্ছিল। তারপর কি মনে করে যেন সে ঐ বুড়ির বাড়ির দিকে গেল। গিয়ে দেখে বুড়ি মাছ রান্না করে প্লেটে ভাত বেড়ে বসে রয়েছে এবং কাদছে আর বলছে "খোকা তুই এখনো এলিনা, রাত কেটে ভোর হয়ে যাচ্ছে আমাকে কি তোর দেখার স্বাধ জাগেনা?"
হঠাৎ তার মনে পরল ঐ লোকটির কথা রাতে যাকে তার বাবা বিন্তাল ঘাড় মটকিয়ে মেরে ফেলেছে। সে এক মুহুর্ত্ব চিন্তা করে ঐ লোকটির রুপ ধারন করল এবং বুড়ির সামনে গিয়ে দাড়াল। বুড়ি তাকে দেখে নিজের খোকা ভেবে বুকে জড়িয়ে ধরল এবং কান্নাকাটি করে বলতে লাগল আমাকে রেখে একা কিভাবে থাকলি এতদিন। তারপর দুজন মিলে খাবার খেল। ইন্তাল ভাবল তাকে এখনই চলে যেতে হবে, ভোরের আলো ফুটে উঠলে সে ঠিকতে পারবেনা। তাই সে বুড়িকে বলল, মা আমি একটি কাজে যাচ্ছি আবার রাতে আসব। এই বলে বিদায় নিয়ে তার গাছে চলে আসে।
এভাবে সে প্রতিরাতে মাছ নিয়ে বুড়ির বাড়িতে যায় এবং সকাল হওয়ার আগেই চলে আসে। সে তার বাবার করা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে যাচ্ছে এবং তার বাবাকে সে চাপ দিচ্ছে যেন আর কখনো কারো ঘাড় না মটকায়। সে চায়না তাদের কারনে কোন মানুষ কষ্ট পাক।
গল্পটির উদ্দেশ্যঃ খারাপ পরিবেশে জন্মেও ভাল কাজ করা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন