পদ্মা পাড়ের তাগড়া জোয়ান করিম লোকজন ডাকে করিম্যা কিন্তু তাতে তার কোন আক্ষেপ নেই।
গাঁয়ে সবাই তাকে এক নামে চিনে। পেশা তার দিনমজুরি। সে এলাকার সবার চেয়ে বেশী কাজ করতে পারে। তার বাবা মা সখ করে তার বিয়ে ঠিক করল পাশের গ্রামের জলিল মুন্সির মেয়ের সাথে। কিন্তু সে বলল তাকে যৌতুক হিসেবে একটি বাই সাইকেল ও নগদ ১৫০০০ টাকা দিতে হবে তা নাহলে সে বিয়ে করবে না। মেয়ের বাবা রাজি না। সে সাইকেল দিতে পারবে কিন্তু এত টাকা একসাথে দিতে পারবেনা। সে তাই বলল বিয়ের পর আস্তে আস্তে টাকা দিয়ে দিবে। তাতে সবাই রাজি হয়ে ধুমধামের সাথে করিমের বিয়ে হয়ে গেল।
প্রথম কিছুদিন সব কিছু ভালই চলছিল। কিন্তু করিম হঠাৎ তার বউকে তার বাবার বাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা আনার জন্য পিড়াপিড়ি শুরু করল কিন্তু তার বউ বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে পারল না। তাই করিম তার বউয়ের উপর নির্যাতন শুরু করল।
এভাবেই করিমের বউয়ের কুল জুড়ে শন্তান এলো, কিন্তু শন্তানটি ছিল মেয়ে। তাই করিম খুশী হতে পারল না। সে চেয়েছিল ছেলে। সে বউয়ের উপর নি্যোতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। যেন মেয়ে হওয়ার জন্য একমাত্র তার স্ত্রীই দায়ী। এভাবে ছেলের আশায় সে আরো তিনটি শন্তান নিলো কিন্তু সবগুলোই হলো মেয়ে। চার নম্বর শন্তানটি জন্ম দেওয়ার সময় তার বউ মারা গেল। এই শন্তানদের এখন কে দেখবে? তাই সে আবার বিয়ে করলো।
নতুন বউয়ের কোলজুড়ে কিছুদিন পর তার শন্তান এলো তার অতি কাংখিত ছেলে শন্তান। শন্তান গুলো বড় হতো থাকল।
ঐদিকে পদ্মা তীব্রভাবে ছোবল হানছে তার একমাত্র সম্বল ভিটামাটির উপর। সে তার বউ বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এলেও তার ভিটেমাটিকে রক্ষা করতে পারল না। তার চোঁখের সামনে তা পদ্মার ছোঁবলে গ্রাস হয়ে গেলো। এখন সে কোঁথায় যাবে? কোঁথায় থাকবে? সে দিশেহারা হয়ে পড়ল।
সে তার পরিবার নিয়ে ঢাকার উদেশ্যে রওনা হল। সে ঢাকায় এসে ফুটপাতে কিছুদিন থাকার পর একজনের সহায়তায় একটি বস্তিতে উঠার সুযোগ পেলো এবং ঐলোক তাকে একটি রিকশা গ্যারেজে নিয়ে তাকে একটি রিকসা চালানো দায়িত্ব দিল। সে সারাদিন রিকশা চালায় এবং তার ছেলে মেয়েদেরকেও বিভিন্ন কাজে পাঠিয়ে দেও। তার দুই মেয়েকে সে অন্যের বাড়িতে কাজ করার জন্য পাঠায়, অন্য দুই মেয়েকে সে পাঠায় রাস্তায় ফুল বিক্রি করতে। তার ছেলেকে সে গ্যারেজে দিয়ে দিয়েছে কাজ শেখার জন্য। কিন্তু সে এতগুলো মানুষের ভরনপোষন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল। তাই সে তার বড়মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তুা করল। তার বড় মেয়েটির বয়স ১৫ বছর । সে একটি পাত্র পছন্দ করে ফেলল। কিন্তু পাত্রের দাবি একটি রঙিন টেলিভিশন ও নগদ ৩৫০০০টাকা। করিম বিয়ের পর সব আস্তে আস্তে শোধ করবে এই কথা বলে তার মেয়েকে এই অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিল।
তার সবগুলো মেয়েকে সে বিয়ে দিয়ে দিল প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই।
আস্তে আস্তে সময় অনেক সময় কেটে গেল।
তার প্রথম মেয়েটি চলে আসল বাপের বাড়িতে। কারন তার স্বামীর নির্যাতন। যৌতুকের টাকা করিম দিতে পারেনি। করিমের একমাত্র ছেলে এখন আর করিমের সাথে নেই। সে বিয়ে করে তার বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। তার বাবা মাকে দেখার সময় নেই।
করিম আজ ৭৫ বছরের বৃদ্ধ তাকে দেখার কেউ নেই। তার বাকি মেয়েরা চাইলেও তাদের শশুরবাড়ির লোকদের জন্য তার বাবা মাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে রাখতে পারছেনা। তার স্ত্রী প্রচন্ড অসুস্থ। বেঁচে থাকার তাগিতে এই বৃদ্ধ বয়সে আবার রিকসা নিয়ে বেড়িয়ে পরতে হলো। তার বয়স্ক পাদুটোতে আগের মতো জোড় নেই। সে রিকসা টানতে পারছে না। সে আজ হেরে যাচ্ছে ।
( উপরের ছবিটা করিমের নই কিন্তু এই রকম করিম আমাদের দেশে অনেক আছে যারা খুব অসহায়।)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন